তখন গ্রীষ্মকাল। এক কুর্দি মেষপালক প্রতিদিনের মতো তার ভেড়াগুলো চড়াচ্ছিল। আকাশে মেঘের কোন নাম-নিশানা নেই। যত দূর চোখ যায় রুক্ষ কঠিন পাহাড় আর পাথর। দূর-দুরান্ত পর্যন্ত মানুষের কোন হদিস নেই। বাতাসের শন শন শব্দ ছাড়া নেই কোনও সাড়া শব্দ। কয়েকটি চিল আকাশে ঘূর্ণায়মান। ক্লান্ত-শ্রান্ত মেষপালক খুব সতর্ক, শেয়ালের ভয় আছে। তার পোষা কুকুরটাও এ বিষয়ে সজাগ।
মেষপালক তার ভেড়াগুলোকে অনুসরণ করে এক সময় ছোট ছোট টিলায় ঘেরা একটি উঠোনের মতো জায়গায় চলে আসে। হঠাৎ মরুর নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়ে একটি ভেড়ার গলার ঘন্টার ঝনঝন শব্দে। মেষপালক চমকে ওঠে। শেয়াল নাতো! কুকুরটাকে নিয়ে ছুটে যায় সেই ভেড়াটির কাছে। কাছে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, ভেড়াটি সুরক্ষিত। একটি পাথরে লেগে বেজে উঠেছিল ঘন্টাটি। কিন্তু ধুলা-বালিতে ঢাকা এই পাথরটি একটু অন্যরকম। মেষপালক পাথর টুকরোটি পরিস্কার করে দেখলো, পাথরটি দীর্ঘ এবং সুন্দর করে কাটা। সে তার ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে বিস্মিত, চারপাশে এমন আরো অনেকগুলো পাথর খ- ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সে বুঝলো, এটি কোনও সাধারণ স্থান নয়। সবাইকে জানানোর জন্য মেষপালক তখনই তার গ্রামে ফিরে যায়।
মেষপালক সেদিন সঠিক ছিল। সত্যিই সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থানের একটি। ১৯৯৪ সালে এক মেষপালক যে স্থানটি আবিষ্কার করেছিল সে স্থানটি এখন গোবেকলি তেপে (Gobekli Tepe) নামে বিশ্বে পরিচিত। তুর্কি গোবেকলি তেপে শব্দের অর্থ ‘উদর বিশিষ্ট পাহাড়’। গোবেকলি তেপে প্রাঙ্গনটি তুর্কির উরফা শহর থেকে মাত্র ৬ মাইল দূরে অবস্থিত। ১৯৯৪ সালের পূর্বের ৫০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। মেষপালকের আবিষ্কারের খবর প্রথম পৌছায় তুর্কির সানলিউরফা (Sanliurfa) শহরের একটি জাদুঘরে। তারা তা জানায় ইস্তানবুলে অবস্থিত জার্মান আর্কিওলজি ইনস্টিটিউটকে। ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে ’৯৪ সালের শেষ দিকে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লাউস স্মিড (Klaus Schmidt) প্রথম গোবেকলি তেপের খনন কাজ শুরু করেন। তবে এর আগেও ১৯৬০-এর দিকে শিকাগো ও ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয় গোবেকলি তেপের সন্ধান পেয়েছিল। কিন্তু তারা তখন এটিকে একটি সাদা-মাটা কবরস্থান ভেবে তেমন পাত্তা দেয়নি।
স্মিড গোবেকলি তেপে থেকে আবিষ্কার করেন অনেকগুলো প্রত্নবস্তু। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হলো কতগুলো টি-আকৃতির পাথরের স্তম্ভ। স্তম্ভগুলোর গায়ে খোদাই করা বিভিন্ন ধরনের নকশা। এ পর্যন্ত মোট ৪৫টি স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়েছে। খোদাই করা ছবি সম্বলিত স্তম্ভগুলোর উচ্চতা ১৬ ফুট পর্যন্ত এবং ওজন ৭ থেকে ১০ টন। শুকর, হাঁস, সাপ, শিয়াল, বাঘ, সিংহ, বিছা, শকুন এবং শিকার খেলার ছবি খোদাই করে স্তম্ভগুলোর গায়ে সাঁটা। স্তম্ভগুলো বসিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ছোট-বড় বৃত্ত। অনেকটা ইংল্যান্ডে স্টোনহেঞ্জের মতো। তবে গোবেকলি তেপেতে এই বৃত্ত সংখ্যা একাধিক। বৃত্তগুলো আবার ঘিরে দেয়া হয়েছিল দেয়ালে। ফলে বৃত্তগুলো দেখতে অনেকটা কুয়োর মতো। বৃত্তগুলোর ব্যাস ১৫ থেকে ৩০ ফুট। ধারনা করা হচ্ছে ২২ একর জায়গায় কমপক্ষে আরও ১৬টি বৃত্ত আবিষ্কার হওয়া বাকি। এখন পর্যন্ত গোবেলিক তেপের মাত্র ১ একর জায়গা খনন করা হয়েছে।
কবে, কেন, কিভাবে তৈরি করা হয়েছিল এই গোবেকলি তেপে? স্তম্ভগুলোর গায়ের ছবি, সংকেত এবং প্রাঙ্গন তৈরির অন্যান্য উপাদান রাসায়নিক পদ্ধতিতে বিচার বিশ্লেষণ করে প্রত্নবিদরা ঘোষণা দেন, গোবেকলি তেপে ১২ হাজার বছরের প্রাচীন! কেউ কেউ বলেন ১৩ হাজার বছরের পুরনো। এ তথ্যের সাথে একমত পোষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইয়ান হোডার (Ian Hodder) বলেন, গোবেকলি তেপে ইতিহাসকে ওলোট-পালোট করে দিয়েছে। দক্ষিণ আফিকার উইটওয়াটারস্রেন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (Witwatersrand University) অধ্যাপক ডেভিড লুইস (David Lewis) বলেন, গোবেকলি তেপে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নকেন্দ্র। আরেক প্রত্নবিদ স্টেভ মিথেন বলেছে যে গোবেকলি তেপে তার কাছে এক বিস্ময় যা তিনি বুঝে উঠতে পারেন না।
খ্রিস্টপূর্ব ১০ হাজার বছর পূর্বে মন্দিরটি প্রস্তর যুগের মানুষরা তৈরি করেছিল। মনে করা হচ্ছে এখন পর্যন্ত এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রত্নকেন্দ্র। কেননা প্রচীনতম প্রত্ননিদর্শন স্টোনহেঞ্জ ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং মিসরের গিজা পিরামিড ২ হাজার ৫শ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নির্মিত। ক্লাউস স্মিড ১০ বছরের বেশি সময় ধরে গোবেকলি তেপের ওপর গবেষণা করছেন। তিনি দাবি করেছেন গোবেকলি তেপে মানুষের তৈরি প্রথম উপাসনালয় বা মন্দির। নকশাকাটা পাথর স্তম্ভে গড়া বৃত্তগুলো তাই প্রমাণ করে। তখন এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি ছিল কৃষিবান্ধব, তাই আফ্রিকা ও পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের শিকারিরা বসবাসের জন্য তুর্কিকে বেছে নিয়েছিল। তারা শিকার ও কৃষি নির্ভর ছিল এবং চামড়ার তৈরি তাবুতে বসবাস করতো। খননের সময় প্রাপ্ত তীরের বেশ কিছু শলাকা প্রমাণ করে শিকারিরাই এই মন্দিরটি ব্যবহার করতো।
গোবেকলি তেপেকে ঘিরে মিথও আছে। কথিত আছে এটিই বাইবেল বর্ণিত সেই ইডেন উদ্যান, যেখানে আদম ও ইভ নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের পূর্বে সুখে বসবাস করতো।
সে যাইহোক, ১২-১৩ হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নকেন্দ্র সম্বন্ধে শত ভাগ সঠিক তথ্য পাওয়া অসম্ভব। গোবেকলি তেপে সম্বন্ধে বলতে গিয়ে প্রত্নবিদদেরকে অনুমান ও ধারণার আশ্রয় নিতে হয়েছে, প্রমাণ ক্ষীন। রহস্য থেকেই যায়। প্রত্নবিদরা বলছেন, গোবেকলি তেপের নির্মাতারাই এটিকে মাটি দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল। কিন্তু মিথ অন্য কথা বলে। কথিত আছে, একদা দেবতারা শিকারীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে গোবেকলি তেপে ধ্বংস করে দেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতানুসারে, যদি শিকারীরাই মন্দিরটি সমাধিস্থ করে থাকে, তাহলে প্রশ্ন জাগে-কেন করেছিল? উত্তর নেই।
সহায়ক গ্রন্থ : The Genesis Secret-Tom Knox"
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন