ইয়ে, যেহেতু সবাই ভুলে গেসে সামিয়া হোসেন কে ছিল, তাই আগের ব্লগটার লিঙ্ক দিয়ে দিলাম।
৩৬ দিনের দেশ
যশোর রোড ধরে আগাতে আগাতে আগাতে আগাতে একসময় আমরা কলিকাতায় পৌছে গেলাম। কলিকাতা, …আমার অঞ্জনের চোখ দিয়ে দেখা কলিকাতা। আপনি যদি কখনো অঞ্জনের ‘নিয়ে যা’ গানটা না শুনে না থাকেন, তবে অতি অবশ্যই শুনে ফেলবেন।
তিনশ বছরের পুরনো শহর এই কলকাতা। জোব চার্ণক এসে ভিড়েছিলেন হুগলীর পাড়ে, সম্ভবত ১৬৯০ সালে। পাশাপাশি তিনটে গ্রাম; সুতানটী, গোবিন্দপুর আর কোলকাতা। সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে গ্রাম তিনটি ইজারা নিল কোম্পানী, শুরু হল কলকাতা মহানগরীর ইতিহাস। ১৯১১ সাল থেকে পুরো ভারতের, আর ভারতভাগের পর থেকে পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী ছিলেন ইনি। কলকাতায় পৌছলাম দুপুরেই, কিন্তু হোটেল পেতে পেতে বিকাল হয়ে গেল। যাওয়ার যায়গা নেই কোথাও, শ্যামলী বাস কাউন্টারই শেষ ভরসা। শ্যামলীর কাউন্টারের ওরা প্রথমে কিছু বলেনি, তবে পরের দিকে কিঞ্চিৎ খ্যাচখ্যাচ শুরু করল, এবং আমরা বাধ্য হলাম ব্যাগব্যাগেজ নিয়ে বের হয়ে যেতে। পুরোপুরি অচেনা একটা দেশে, অচেনা একটা শহরে ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে আমরা এতগুলা মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, নিজেদের খুব অসহায় লাগছিল।
যাই হোক, শেষমেশ পাওয়া গেল। যেহেতু আমরা স্টুডেন্ট মানুষ, তাই কমদামের হোটেল। আমাদের হোটেল হল মীর্জা গালিব স্ট্রীট এ, জায়াগাটা খুবই সিরাম, কারণ কাছেই, মানে হাঁটা দূরত্বে নিউমার্কেট, চৌরঙ্গী, এসপ্লানেড, ময়দান, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল…এইসব।
কলকাতা শহরের মজা হলো, আমি যেই জায়গায়তেই যাই, সেখানের নামই আমার চেনা। হোটেলে উঠেই সন্ধ্যায় বের হয়ে গেলাম নিউমার্কেট। এত জীবন্ত জায়গা খুব কম ভারতের বাকি শহরগুলোয়। মানুষ হাটছে, আড্ডা দিচ্ছে, কেনাকাটা করছে, খাচ্ছে। নিউমার্কেটের এক ধার দিয়ে হাটা শুরু করলাম আমরা, অপারেশন স্ট্রীট ফুড। পাঁপড়িচাট, ফালুদা, আইস্ক্রীম, গোলে-গাপ্পা…বাকিগুলার নাম মনে পড়ছে না, কিন্তু অনেক জিনিসপাতি সেদিন পেটের মধ্যে গেছে এইটা মনে আছে। নিউমার্কেটটা মজার, সামনে একটা প্লাজা আছে, যেখানে মানুষজন আড্ডা দিতে পারে। সেদিন পূর্ণিমা ছিল না, কিন্তু নীল আকাশে একটা সবজেটে চাঁদ ছিল, অনেক্ষণ ধরে সেই প্লাজায় বসে আড্ডা দিলাম আমরা। বেশ খানিকটা রাত করে হোটেলে ফিরলাম।
এবারে কোলকাতা শহরটা আমাদের ট্রানজিট, তাই হাতে ছিল কেবল একদিন। সকালে উঠেই দৌড় দিলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দিকে। চৌরঙ্গী ধরে হাটতে হাটতে বহুদুর চলে গেলাম, শংকর পড়ে আমার ধারণা হয়ে গেছিল হোটেল শাজাহান সত্যি সত্যি আছে। অনেক খুঁজেও যখন পেলাম না, আমার আসলেই খুব দুঃখ লেগেছিল। তবে হ্যা, শাহজাহানের সাবস্টিটিউট পেলাম গ্র্যান্ড। গ্র্যান্ড আসলেই সেইরকম গ্র্যান্ড একটা হোটেল, পুরো এসপ্লানেড জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় ময়দান পার হলাম, তারপর হঠাৎ সামনে পড়ল বিড়লা প্লানেটোরিয়াম। বৌদ্ধ তীর্থস্থান স্তুপার আদলে করা এই প্লানেটোরিয়ামের পৃথিবীজোড়া অনেক নামডাক থাকলেও আদতে আমাদের প্লানেটোরিয়ামের কাছে সে কিছুই না, না সাইজে, না শোএর কোয়ালিটিতে। এমুন পচা শো আমি খুব কম দেখসি…যাই হোক, পরের বার যখন কোলকাতায় আসব, তখন একে নিয়ে কথা বলা যাবে, এইবার আমরা একে পাশ কাটায় ভিক্টোরিয়ার দিকে রওনা দিলাম।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ১৯০১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে বানিয়েছিলেন লর্ড কার্জন, ইটালিয়ান রেনেঁসা স্থাপত্যশৈলীর এই বিল্ডিং বানাতে নাকি বিশ বছর লেগেছিল। এখন এটাকে যাদুঘর করে ফেলছে। এই মেমোরিয়ালের চারিদিকে একতা সিরাম ল্যান্ডস্কেপিং এর বাগান আছে, রাত্রের আধো আলোতে যেটাকে দেখলে চোখ ট্যারা হয়ে যায়। আমরা এইখানে ঢুকতে পারিনাই। ভারতীয়দের জন্য ১০ রূপী আর বাকিদের জন্য ১৫০, যারা গেসিলো আমাদের টিকেট কাটতে, লাস্ট মোমেন্টে মহিলা ধরে ফেললো আমরা আসলে বাংলাদেশী। ছাত্র মানুষ, তাই দেড়শ রূপী খরচ না করে বাইরে থেকে ছবিটবি তুলে চলে আসলাম। জিনিসটা সুন্দর আছে, সাদা মার্বেলের তৈরী, মাঝের গম্বুজের একদম চূড়ায় একটা পরী।
ভিক্টোরিয়ার চূড়া
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
যেকোন শহরে ঘুরতে হলেই সবচেয়ে প্রথম যে কাজটা করা উচিৎ তা হল একটা ম্যাপ কিনে ফেলা। আর এ জন্য কোলকাতার সবচেয়ে ভাল জায়গা কলেজ স্ট্রীট। কলেজ স্ট্রীট হল কোলকাতার নীলক্ষেত। যাবতীয় বই, নতুন এবং সেকেন্ড হ্যান্ড, এখানে পাওয়া যায়। সুতরাং কারও যদি বই কেনার উদ্দেশ্য থাকে, অবশ্যই এখানে একটা ঢূঁ দেবেন। ভিক্টোরিয়া থেকে একটা ট্যাক্সিতে চেপে বসলাম আমরা পাঁচজন। কোলকাতার বেশিরভাগ ট্যাক্সি ড্রাইভার, মুড়িওলা-এনারা কেন জানি অবাঙ্গালী। আর ট্যাক্সির নিয়ম আমাদের মত এত সোজা না যে যা উঠবে আপনি তাই দিবেন। যে সংখ্যাটা উঠবে, তাকে একটা গুণিতক দিয়ে গুণ দিয়ে যেই ভাড়া আসবে, আপনাকে সেইটাই পে করতে হবে। এই গুণিতক আবার এলাকা ভেদে ভিন্ন। সুতরাং কোন এলাকায় বিশ টাকা ট্যাক্সি ভাড়া উঠলেই খুশি হয়ে যাওয়ার বিশেষ কারণ নাই।
কলেজ স্ট্রীট যাওয়ার পথে একটা জিনিস খুব চোখে পড়ল, তা হল কলকাতা শহরটা বেশ গুছানো, এবং এই গুছানো অংশটির বেশিরভাগ কৃতিত্ব আসলে বৃটিশদের। একটূ পর পরই ঔপনিবেশিক স্থাপত্য চোখে পড়বে আপনার, এবং মনে মনে একটু তুলনা করলেই আপনি বুঝতে পারবেন, ১৯০৫ সালে ঢাকাবাসী কেন নিজেদের বঞ্চিত মনে করেছিল। মনে করার যথার্থই কারণ ছিল, কারণ তিনশ বছরের পুরোনো এ শহরটির পরতে পরতে এখনো অতীত ঐতিহ্যের নিদর্শন রয়ে গেছে। দুপা হাঁটতে গেলেই একটি করে পুরাতন স্থাপত্যের বিশাল দালান দেখা যায়, ঢাকাতে তো সবই আমরা নূতন করে তৈরী করেছি গেল বছরগুলোতে। যাই হোক…সঠিক শব্দটা মনে পড়ছে না, দুই কথায় বলতে গেলে সেইরকম ড্যাশিং আর স্মার্ট শহর কলকাতা। আই লাভ ইট।
সবচেয়ে যে জিনিসটা সুন্দর, তা হল এ শহরের ল্যান্ডস্কেপ। রাস্তার আইল্যান্ডগুলোতে ছোট ছোট গাছ, আবার এখানে ওখানে দু-একটা গাছ গাছালী। ভাল লাগে। আর একটা শহরে যে পরিমাণ গাছ গাছালী থাকা দরকার, তা এ শহরে আছে। ময়দান, গড়ের মাঠ আর বিভিন্ন পার্ক দিয়ে সবুজের অভাব পুরণ করে ফেলেছে ওরা, আমরা কিন্তু অভাব ক্রমশও বাড়াচ্ছি।
বিখ্যাত কলেজ স্ট্রীট
কলেজ স্ট্রীটে যাওয়ার পথে দেখতে পেলাম গড়ের মাঠ। কলেজ স্ট্রীটে পৌছে ট্যাক্সি ছেড়ে হাঁটতে শুরু করলাম, এবং হঠাৎ সামনে আসল প্রেসিডেন্সী কলেজ!! এবং একটু পর, তার চেয়েও বড় চমক, কফি হাউজ! আমাদের স্বপ্নের কফি হাউজ।
কফি হাউজ
কফি হাউজ
কফি হাউজটা দোতলা আর তিনতলা মিলিয়ে। ঢোকার মুখে বিভিন্ন পোস্টার দেখে বোঝা গেল, এটা আসলে আমাদের আজীজ (সাহিত্যিকদের আখড়া আরকি)। ভেতরটা অত্যন্ত সুন্দর, একটা সিরাম সুন্দর ডাবল হাইট স্পেস আছে, যেটা খদ্দেরদের কথাবার্তায় সারাক্ষণই গমগম করে। ঢুকতেই আপনি হারিয়ে যাবেন অসংখ্য মানুষের রাজত্বে, কোথাও কোথাও চরম উত্তেজনা নিয়ে চলছে রাজনীতি, একটা টেবিলে দুটো লোক তাদের ব্যবসা নিয়ে খুবই চিন্তিত, দূরে আরেক টেবিলে মুখোমুখি বসে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অনিমেষ মাধবীলতা। আর একটা টেবিলে হাসতে হাসতে আরেকটু হলে পরেই যাচ্ছিল সুজাতা, নিখিলেশ, রমা রায়। আমরা নিচতলাটা দেখে টেখে উপরে গিয়ে বসলাম। এজায়গাটা সুন্দর, এখান থেকে নীচটা পুরো দেখা যায়। একদম পেছনের হলুদ দেয়ালে বাল্মীকি নাটকের যুবা রবীন্দ্রনাথ সটান দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছেন, উপরতলাটায় সার সার পেইন্টিং ঝুলানো। কফি হাউজে এসে কফি খাব না তা হয়না, তাই আমরা কফির অর্ডার দিলাম। তবে আমি অত্যন্ত দুঃখিত কারণ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজে কফিটা এখানে খেলাম আমি, এমনকি ব্রিটিশ কাউন্সিলের গরম পানির চেয়েও (ব্রিটিশ কাউন্সিলের কফিটাও এক্কেবারে যা-তা, বাংলাদেশের অবশ্য)। আমরা বসেছিলাম একদম কোনার একটা টেবিলে, জানালাটা দেখতে পাচ্ছিলাম, বাইরের গাছ, কফি হাউজের বেয়ারা…কতশত বছর ধরে ঠিক এভাবেই জানালা দিয়ে বাইরের গাছটা চোখে পরে, ঠিক এভাবেই বেয়ারাকে ডাকে মানুষ! সব মিলিয়ে জায়গাটা আমার এত্ত পছন্দ হলো…বলার না, কেবল কফি আর মানুষগুলো ছাড়া। ওনাদের ব্যবহার কেমন যেন, খুব একটা আন্তরিক না, কেমন তাচ্ছিল্য ফুটে ওঠে চোখে মুখে। এই ব্যাপারটা তেমন ভাল লাগেনি।
যাই হোক, খারাপ লাগাটাকে পাশ কাটিয়ে চলুন আবার আমরা চলে যাই কলেজ স্ট্রীট, কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করি, আর ছোট্ট একটা দোকান থেকে দিল্লী আর রাজস্থানের ম্যাপ কিনে নিয়ে ট্রামে চেপে আবার হোটেলের দিকে ছুটি। চারটার সময় বেরিয়ে যেতে হবে আমাদের আবার, গন্তব্য হাওড়া রেলস্টেশন। ট্রামের লোকটার চামড়ার পয়সার ব্যাগটা খুব পছন্দ হয়ে যাবে আমার, সারাটা রাস্তা ওটার দিকে চেয়ে থাকব, আর ভাবব, বড় হয়ে নিশ্চুই আমি ট্রামের টিকেটওয়ালা হব। হবই হব।
ট্রাম থেকে নেমেই দৌড়াতে দৌড়াতে ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে আবার ট্যাক্সি, হাওড়াতে যেতে যেতে দেখলাম রাইটার্স বিল্ডিং, আর হাওড়া ব্রীজ- বিশাল ব্যাপার। তবে হাওড়া ব্রীজ যে কেন এমন, সেইটা কোন ভাবেই বের করতে পারিনি আমরা কেউ, ব্রীজের ওপরের অংশে বিশাল বিশাল সমস্ত ট্রাস (truss), খুবই সুন্দর লাইটিং নিঃসন্দেহে, কিন্তু লোড ট্রান্সফার তো নিচের অংশেই হয়ে যাচ্ছে, তাহলে উপরের এত কারসাজি কেন? ওরা কি কাজে লাগছে? আগেই ইন্সট্রাকশন দেয়া ছিল, স্টেশনে গিয়েই সবাই খুবই ডিসিপ্লিন্ড ভাবে লাগেজগুলো মাঝে রেখে চারপাশে সার হয়ে দাঁড়ালাম। দেখতে কি যে অদ্ভুত লাগছিল, পঞ্চাশটা ছেলেমেয়ে জড়ো হয়ে দাঁড়ায়ে আছে, সবার মুখে মাস্ক, সোয়াইন ফ্লুর ভয়ে আমরা একটু পর পর হাত ধুচ্ছি, আর নাকের ডগায় মাস্ক পরে আছি। কয়েকটা পুলিশ এসে খানিক্ষন উঁকিঝুকি মেরে চলে গেল, আমাদের চারপাশের ভিড় একটু কমে গেল।
হাওড়া স্টেশন, ফটোক্রেডিট, আজরিন
ইন্ডিয়াতে ট্রেনে চড়ার সময় দুটো জিনিস খেয়াল রাখতে হয়। এক, এখানে সিস্টেমটা হলো এরকম যে রিজার্ভেশন করা যায় এমন কিছু সীট আছে, আর নন রিজার্ভেশনে জেনারেল সীট আছে। রিজার্ভ করে উঠলে নিজের একটা সীট পাওয়া যাবে, (যদিও একটু খেচাখেচি করতে হয় অন্য কেউ বসে গেলে), আর যদি জেনারেল টিকেট হয়, তাহলে সীট পাওয়া যাবে কিনা শিওর না, দাঁড়ায়েও যেতে হইতে পারে। কারণ ট্রেনে যে নির্দিষ্ট সংখ্যক সীট আছে, এরা তার চেয়েও বেশি টিকেট বেচে। প্রতি স্টেশনেই টিকেট বেচতেই থাকে, ট্রেন উপচে পড়বে মানুষ, তার পরেও এরা টিকেট বেচেই যাবে। আর দুই নম্বর ব্যাপারটা হলো, এখানে লাগেজ হারায় প্রচন্ড, তাই সাথে শিকল আর তালা রাখতে হবে, সীটের নিচে আংটা আছে, লাগেজ তার সাথে শিকল আর তালা দিয়ে বেঁধে ফেললে আর কোন চিন্তা নেই। যাই হোক, ট্রেন তো আসল, আমরাও লাফঝাঁপ দিয়ে তাতে উঠলাম, অনেক কিছু পেছনে ফেলে রেখে যাওয়া হল, আবার আসবো আমরা এই কোলকাতায়। আপাতত গন্তব্য দিল্লী।
"
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন